হায়রে ফেজবুক! এক ছবিতেই একটি পরিবারের কান্না!
মোঃ জিয়াউর রহমান:::////
আকাশ আর নদী একটি রিসোর্টের রেস্তোরাঁয় বসে রোমান্স চলছিল। নদী সবে ইন্টারমিডিয়েট শেষ করে অনার্সে ভর্তির অপেক্ষায়, সদ্য যৌবনে পা দেয়া, সুন্দরী, লাস্যময়ী যুবতী। আকাশ স্নাতক শেষ করে একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকুরী করছে, সুদর্শন, টগবগে যুবক। আকাশ আর নদী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পরিচয়। মাস তিনেক আগে একবার দেখা হয়েছিল। সেদিন কেউ, কারো সাথে মন খুলে কথা বলতে পারেনি, পরিচয়ের প্রথমদিকে যা হয়। তাই দুজনেই মুখিয়ে আছে আজ মনের কথা সব বলবে, তিন মাসের জমানো আবেগ, অফুরন্ত ভালোবাসা আজ একে অপরকে উজার করে দিবে। ১২টায় দেখা কখন যেন তিনটা বেজে গেছে টেরই পায়নি দুজনে। মনে হয় আবেগ, মোহ, ভালোবাসা ঘড়ির কাটাকে অচল করে দিয়েছিল। নদী বলল ক্ষুধা পেয়েছে কিছু খেতে হবে। আকাশ বলল শর্ত একটাই, খাবার অর্ডার করবো একপ্লেট আমি আমি তোমাকে খাইয়ে দেব। নদী হেসে বলল আমাকেও একটু সুযোগ দিও। কথাগুলো যখন হচ্ছিল তখন আকাশের কাঁধে নদীর মাথা। আর কথার ফাঁকে ফাঁকে দু,একটা সেলফিও হচ্ছিল দুজনের।
আপন সাহেব রাত দশটার দিকে বাসায় এসে ক্রি ক্রি করতেই ভিতর থেকে রুক্ষ গলায় ভেসে আসলো দরজা খোলা আছে, ইচ্ছে হলে আসেন না হলে রিসোর্টে চলে যান। আপন সাহেব চিন্তায় পড়ে গেলেন, বেগম কোন রিসোর্টের কথা বলছে, বিকেলে প্রোগ্রাম শেষ করে রিসোর্টে গিয়েছিলাম তা তো বেগমের জানার কথা না। তারপরও জিঙ্গেস করলো রিসোর্ট মানে, কিসের রিসোর্ট? বেগম বললো এখন কিছুই জানেন না? আর কোনো কথা বললো না, রাতে খাবারও দিলো না মনে হলো ফুলে আছে। আপন সাহেব নিজের হাতে নিয়ে খেয়ে শুয়ে পড়লো। রাতে যখন বেগমের গায়ে হাত দিতে চেষ্টা করলো তখন ফোঁস করে উঠল এবং হাত সরিয়ে দিলো। আপন সাহেব বললো কি হয়েছে, আমাকে খুলে বলো? বেগম কিছু বললো না, উল্টাদিকে হয়ে শুয়ে রইলো। পরেরদিন গরম আরেকটু বেশি মনে হলো। আপন সাহেব কিছু বুঝতে পারছে না, নিজে থেকেও কিছু বলতে পারছে না কারণ ঝরেও বক মরতে পারে, তারপরে আবার কোন প্যাচেঁ পড়ে? বেগমও কিছুই বলছে না শুধু দিন দিন গরমের তাপমাত্রা বাড়ছে। প্রথম কয়দিন কথা বলা বন্ধ ছিল এরপর কয়দিন কথায় ঝাঁজে আপন সাহেব বাসায় আসতে পারছিল না, কয়েকদিন বাহিরেও থাকলো। পরিস্থিতি আরো খারাপ হলো। বেগম একদিন বলে ফেললো যে পুরুষ অন্য মহিলা নিয়ে রিসোর্টে যায় তার সাথে আমি সংসার করবো না, একদম না। আপন সাহেব বললো এতো পাগলামি না করে ভেবেচিন্তে কথা বলো, কি হয়েছে আগে শুনো। বেগম বললো আর কিছু শুনার নাই, আমি অনেক ভেবে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি, তোর সাথে আর কোনো সংসার না, তোর কাপড়চোপড় নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যা আর আমার ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দিবি। চরম দূর্ব্যবহার হজম করেও আপন সাহেব আবার বললেন তুমি না শুনে, না বুঝে এমন একটা সিদ্ধান্ত নিতে পারো না। বেগম বললো আর বুঝা লাগবে না, তুই বাসা থেকে বের না হলে এই শিশু বাচ্চাদের নিয়ে আমি বের হয়ে যাবো। ওদের নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় থাকবো। আপন সাহেব কোনো উপায়ান্ত না দেখে প্রয়োজনীয় কাপড়চোপড় আছে দু,চোখে পানি নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে গেলো। আপন আর আশার একযুগের সংসার, ভালোলাগা, ভালোবাসা, প্রেম, বিয়ে। আশা চাকুরির কথা বলে বাড়ি থেকে আপন সাহেবের কাছে চলে আসছিল। ১২ বছরের সংসারে অনেক দুঃখ, কষ্ট, মান অভিমান হয়েছে। কিন্তু কি এমন সমস্যা যার কারণে এভাবে সব এলোমেলো হয়ে যাবে তা আপন সাহেব বুঝতে পারছে না। আর কোনো কথা না বাড়িয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে গেলো কারণ কথা বললে আশা বেশি পাগলামি করে।
বেশ কিছুদিন আপন সাহেব বন্ধু বান্ধবের বাসায়, এখানে সেখানে খেয়ে না খেয়ে কাটালেন। টেনশনে আর ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া না হওয়ায় দিনদিন অসুস্থ হয়ে পড়ছিল। আশা জানতো তার রান্না ছাড়া সে অন্য কারো রান্না পছন্দ করে না।
একদিন মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়লে দুই বন্ধু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করালো। বাসায় খবর দিল আপন সাহেব খুব অসুস্থ তাকে হাসপাতালে ভর্তি করালো হয়েছে, তারপাশে আমরা দুই বন্ধু ছাড়া কেউ নাই, আমরাও বেশিক্ষণ থাকতে পারবো না, কাজে যেতে হবে। আশার প্রথম শব্দ ছিল ওরে দেখার কতো মানুষ আছে? পরে বাচ্চাদের তৈরি করে প্রায় দুইঘন্টা পর হাসপাতালে গিয়ে দেখে হাসপাতালের বেডে একা, অসহায়ের মতো পড়ে আছে আপন সাহেব, ঠিকমতো কথা বলতে পারছে না, আটকিয়ে যায়।
আপন সাহেব আশাকে বললেন তুমি যদি আমাকে ছেড়ে সুখে থাকো, থাকো কিন্তু একবার শুধু বলো কি এমন অপরাধ আমার, কেনো এভাবে এতগুলো দিন আমাকে এভাবে কষ্ট দিলে, তুমি জানো তোমাকে ছাড়া আমার ঘুম আসে না, তোমার রান্না ছাড়া আমি খেতে পারি না। কথাগুলো বলতেও খুব কষ্ট হচ্ছিল আপন সাহেবের।
আশা বললো মিথ্যা কথা রিসোর্টে গিয়ে অন্য মেয়ে নিয়ে খেতেতো মজাই লাগে, তখনতো ঘরের খাবারের কথা মনে থাকে না। আপন সাহেব বললেন কি এমন দেখেছো আমাকে খুলে বলো প্লিজ, আসল ঘটনা না জানলে আমি মরেও মনে হয় শান্তি পাবো না।
তখন আশা বলতে লাগলো আমার ফেজবুকে আকাশ নামে একটা ছেলের এড আছে। ঐদিন রিসোর্টে আকাশ একটা মেয়ের সাথে কাছাকাছি বসে দুইটা সেলফি পোস্ট করে আর সেই সেলফিতে কিছুটা দূরে অন্য টেবিলে একটা মহিলার সাথে আপনি বসে আছেন।
আপন সাহেব বললেন এই কথা তখন জিঙ্গেস করলেইতো আমার আজ এই অবস্থা হতো না।
ঐদিন আমাদের সংগঠনের একটা প্রোগ্রাম ছিল, প্রোগ্রাম শেষে সবাই রিসোর্টে গিয়ে হালকা কিছু খাবে। আমি ব্যানার, কাগজপত্র গুছিয়ে একটু পরে যাই তাই এক টেবিলে জায়গা না হওয়ায় কাছাকাছি পরের টেবিলে বসি অবশ্য ঐ টেবিলে একটা অপরিচিত মহিলা বসা ছিল। ঐ একটা ছবির জন্য আমাকে কিছু না জিঙ্গেস করে এতটাদিন এভাবে কষ্ট দিতে পারবে? এই তোমার ভালোবাসা, এই তোমার বিশ্বাস, এই তোমার একযুগের সংসার? হায়রে ফেজবুক! আর কতো মানুষকে কাঁদাবি?
—
লেখক- মোঃ জিয়াউর রহমান
১১.১০.২০২৪ শুক্রবার
(বেলা ১০.০০-১.০০
(লেখাটি সম্পূর্ণ লেখকের ব্যক্তিগত অভিমত, কারো জীবনের সাথে মিলে গেলে লেখক দায়ী নয়।)